Advertisement

এ্যালকোহলিজম (অতিরিক্ত মদ্যপানের বিষক্রিয়া) এবং সুবিবেচিত পথ্যবিধি

মদ্যপান একটি দীর্ঘকালীন অসঙ্গতি যার থেকে কোন কোন মানুষ শারীরিক মানসিক কারণে ঘন ঘন অতিমাত্রায় মদ্যপান করা থেকে বিরত থাকতে পারে না।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থামদ্য পানকে বিংশ শতকের ভয়ঙ্কর মারণ রােগের তিনটির মধ্যে একটি বলে তালিকাভুক্ত করেছে। এই মদ্যপান একটি সাংঘাতিক সামাজিক সমস্যা। প্রায়ই তা দারিদ্র্য বয়ে আনে, এবং কিছু পরিমানে এমন দন্ডনীয় অপরাধ ঘটায়, যার ফলে পতি-পত্নির মধ্যে ঝগড়া-অশান্তি লেগেই থাকে, ফলে সংসারে আসে ভাঙ্গন। তাছাড়াও পথ-ঘাটে অসংখ্য দুর্ঘটনার কারণও এই মদ্যপান।

মদ্য প্রকৃতি জাত উৎপাদিত বস্তু নয়। এটা শুধুমাত্র পচানাে জিনিষের ফল এবং সেই কারণেই এক বিষাক্ত শ্রেণীর পরিবার ভূক্ত। মদ, বিয়ার, চোলাই মদ - ইত্যাদির প্রধান উত্তেজক উপাদান হচ্ছে - ইথাইল এ্যালকোহল - এক বিষাক্ত ড্রাগ, যা মস্তিষ্ক এবং শিরা-উপশিরার সুসম্বন্ধ প্রনালীকে হীনবল করে দেয়। এ্যালকোহলকে কখনও খাদ্য বলা যাবে না কারণ তা খাদ্যনালীতে ঢুকে যায় এবং কোন ভাবেই তার আর কোন পরিবর্তন হয় না বা হজম হয় না। খুব তাড়াতাড়ি তা রক্তপ্রবাহের সাথে মিশে যায়, আর তার পর সমস্ত শরীরে তা চলমান হয়ে শরীরের মূল্যবান দুটি অঙ্গ মস্তিষ্ক এবং যকৃতে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে। প্রায় ৯০ শতাংশ এ্যালকোহল যকৃতে গিয়ে ধীরে ধীরে অম্লজানের মিশ্রণ ঘটায়, আর ১০ শতাংশ যা বাকি থাকে তা নিঃশ্বাস এবং প্রস্রাবের সাথে বের হয়ে যায়। গড়ে এক পেগ হুইদ্ধি, ১২ আউন্স বিয়ার অথবা আউন্স মদ লিভারে অম্লজানের মিশ্রন ঘটাতে সময় নেয় পুরাে এক ঘন্টা

লক্ষণ:অতিরিক্ত মদ্যপায়ী মদ্যপ তারাই, যাদের মদের উপর নির্ভরতা এমন এক ডিগ্রীতে পৌঁছয় যে, তাদের মানসিক গলােযােগ দেখা দেয়, তাদের দৈহিক মানসিক স্বাস্থ্য, তাদের পারস্পরিক ব্যক্তি সম্পর্ক, তাদের স্বাভাবিক। স্বচ্ছন্দ সামাজিক আর্থিক কর্ম ক্ষমতা অথবা এই সব ছােট খাটো অসংগতি গুলাে, তাদের মধ্যে চোখে পড়ার মত হয়ে দাঁড়ায়।

তাদের মুখমন্ডল সব সময়েই ফোলা ফোলা, রক্তচক্ষু, ফ্যাসফ্যাসে গলার আওয়াজ আর দ্রুত নাড়ী সঞ্চালন হয়ে থাকে। তারা সন্দেহ প্রবণ, বিরক্তিকর এবং অতিরিক্ত আবেগপ্রবন হয়ে থাকে। প্রলাপ বকা, ক্ষতিকর বিচার বিবেচনা, ঘুম বিঘ্নিত হওয়া মদ্য পানের এগুলি কিছু কিছু সাধারণ লক্ষণ।

বহুদিন ধরে যারা মদ্য পান করে, তারা বরং খায় কম, পান করে বেশী। ফলে যথেষ্ট পরিমাণে ভিটামিন পায় না। যেটুকু ভিটামিন খাবার থেকে সংগ্রহ করে, এ্যালকোহলের জ্বালানী হয়ে প্রথাসিদ্ধ ভাবে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। এই ভিটামিনের অভাবে প্রলাপ বকা, সমস্ত শরীর ভীষণ ভাবে কাপা, স্নায়ু-প্রদাহ, চোখের দৃষ্টির অস্বচ্ছতা, এবং স্মৃতিশক্তির ক্ষতিসাধন হয়। অতিরিক্ত মদ্যপানে ভিটামিনের অভাব হয় বলে প্রায়ই চুলের অকালপক্কতা দেখা যায়। অনেকদিন ধরে মদ্য পানে শরীরের খনিজ পদার্থ নিঃশেষিত হয়ে যায় ম্যাঙ্গানিজ কমে গেলে হাত-পা কাঁপে, জিহ্বা কঁপে, শরীরে আলােড়ন হয়, চোখে অন্ধকার দেয় আর খুব ঘাম হয়।

মদের মধ্যে একটা অভ্যাস তৈরী করার প্রবণতা আছে। যত তুমি পাবে, তত তুমি আরও চাইবে। যত বেশী তুমি পান করবে, তত কম তুমি খাবার খাবে। তাতে, অনুযুক্ত রকমের এবং অপর্যাপ্ত পরিমানে জ্বালানীর অভাবে শরীর তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে। অতিরিক্ত মদ্যপানে লিভারের উপরে চাপ সৃষ্টি করা হয়। তাতে ক্রমে ক্রমে লিভারের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যায় আর তা অনেক সময়েই লিভার সিরােসিসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এতে পেটের পায়খানায় গােলমাল হয়। প্রায়ই মস্তিষ্কের কোষ এর দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং সেইজন্য মস্তিষ্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাদক হৃদ্যন্ত্রকেও রেহাই দেয় না তা দুর্বল স্কুল হয়ে পড়ে

কারণ:অতিরিক্ত সুরা পান করার ফলে মদ্য পান জনিত বিষক্রিয়া ঘটে শরীরে। তুলনামূলক ভাবে বিচার করলে দেখা যায়, কোন কোন সময় একজন মানুষ অতি দ্রুত মদ্যপানের বিষক্রিয়ায় ডুবে যায়, আবার অন্য সময়ে একজন মানুষের পুরােপুরি মদ্যপ হতে সময় লেগে যায় অনেক বছর। কোন মানুষ সাধারণতঃ সুরা পান করে সামাজিক জীবনে নিজেকে তুলে ধরার উপায় হিসেবে, দুশ্চিন্তা থেকে রেহাই পাবার জন্য, অথবা নিদ্রাসুখে ডুবে যাবার জন্য। সে মদ্যপ হয় তখনই, যখন সে শারীরিক মানসিকভাবে মদের উপর নির্ভর করে। জীবনের কঠিন চাপ অতিরিক্ত পরিশ্রমের অবসাদ কাটানাের জন্য সে অতিরিক্ত সুরাপানকে আশ্রয় করে।

সুবিবেচিত পথ্যবিধি:যিনি বহুদিন ধরে সুরা পান করেন, সবচেয়ে প্রথমে তাকে দৃঢ় সংকল্প হতে হবে যে তিনি সুবাপান বন্ধ করবেন। এবং তক্ষুণি তাকে তা বন্ধ করতে হবে এই কারণে যে, এই অভ্যাস থেকে আস্তে আস্তে ক্রমান্বয়ে সরে আসা যায় না সেজন্য, তিনি সিদ্ধান্ত নেওয়া মাত্র সুরাপান থেকে বিরত হবেন। মাদক বর্জনের সবচেয়ে ফলপ্রসূ উপায় হলাে- শরীরের মধ্যে এমন পৌষ্টিক বিশুদ্ধতা গঠন করতে হবে যা উত্তেজক পানীয়ের প্রতি আসক্তিকে বাধা দেবে। প্রথম প্রথম রােগী কমপক্ষে ১০ দিন শুধুমাত্র বিশােধন রসের উপরে থাকবে। এই সময়ে সকাল ৮টা থেকে রাত্রি ৮টার মধ্যে তাকে প্রতি দু ঘন্টায় একটা করে কমলালেবুর রস পান করতে হবে। ইচ্ছে হলে, ঈষদুষ্ণ একটু জল রসে মিশিয়ে নেওয়া যেতে পারে। অন্য কোন কিছু খাওয়া চলবে না - নতুবা উপবাসের মূল্যই সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যাবে। বিকল্পে, সজীর রস গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রতিদিন উপবাসকালে নিজস্ব শারীরিক পদ্ধতিতে মল ত্যাগের সঙ্গে ভিতরকার বিষাক্ত পদার্থ সব বের করে ফেলতে হবে। ক্ষেত্রে, গরম জলে এনিমার দ্বারা তা করা যেতে পারে।

রস-সেবন উপবাস কালে রােগী সাধারণতঃ সুরাপানে আসক্তি অনুভব করে না। এটা পান-অভ্যাস ভঙ্গ করার জন্য ১০ দিনের একটা আরম্ভ মাত্র। এটি শারীরিক মানসিক নির্ভরতা দূর করতেও সাহায্য করে। রস-ভিত্তিক প্রাথমিক উপবাসের পর শরীরের কর্মশক্তি ক্রয়তা বাড়াবার জন্য পুষ্টিকর আহার দেওয়া অপরিহার্য। সেরকম খাদ্যের মধ্যে থাকা উচিত - খােসা-সহ খাদ্যশস্য, বাদাম, অঙ্কুর বীজ-

টাটকা ফল তরিতরকারী সকালের খাবারে থাকবেতাজা ফল দুধ ভাপে সেদ্ধ সজী, খােসা ছাড়ানাে গমের চাপাতি, মাখন-তােলা দুধ এগুলি দুপুরের আহারে দেওয়া যেতে পারে আর বাতের খাবার হবে - বেশ ভাল পরিমাণে স্যালাড অঙ্কুরােদ্গম বীজ দিয়ে

চিকিৎসা সুরুতে রােগীকে সেইরকম কিছু খাবার দেওয়া বিধেয়, যা ফেলে আবার সে মদের জন্য আসক্তি অনুভব না করে। সবচেয়ে ভাল প্রতিকল্প হলােএক গ্লাস ফলের রস - ইচ্ছে হলে তাতে মধু মিশিয়ে মিষ্টি করে নেওয়া যায়। এর পরিবর্তে ক্যান্ডিও দেওয়া যেতে পারে। রােগী যদি ভীষণ ভাবে কোন উত্তেজক পদার্থের প্রয়ােজন অনুভব করে তবে দুটি আহারের মধ্যবর্তী সময়ে তাকে সবসময় সহজইে ক্যান্ডি, রস বা অন্যান্য জল খাবার ইত্যাদি দেওয়া উচিত।

সমস্ত পরিশুদ্ধ খাদ্য যেমন - চিনি, কলে - ছাটা চাল, ময়দা এবং পশু-মাংস এই খাদ্যগুলি এড়িয়ে চলা উচিত। রােগী যদি দুই বা তিন বড় মাপের খাবারের বদলে কয়েকবার পছন্দমত অল্প অল্প খাবার খায়। তাহলে সেটাই বেশী ভাল তাদের খাদ্যে গােলমরিচ, সরষে, লঙ্কা এইগুলি বাদ দেওয়া উচিত। রােগী ধূমপান করবেন না কারণ তাহলে সুরাপানের ইচ্ছা বেড়ে যায়।


Post a Comment

0 Comments